Thursday, May 26, 2016

Bodhodhoy

বোধোদয় 

ফ্রাঙ্কফুর্ট যাব বলে Lufthansa প্লেন টা উড়ল ঠিকই কিনতু পৌছালো আর কোথায়।  সেই গত ২ ঘন্টা ধরে কলগ্নে শহরের উপর ঘুরপাক খাচ্ছে।  তুষার ঝড়ে নাজেহাল অবস্থা Frankfurt এর।  লুপ্ত হংস কেন চামচিকাও নামতে পারছেনা। ঘন্টা দুএক কসরত করে প্লেন টা নামলো কলগ্নে। বাঙালি মন সদাই ভবঘুরে। ওয়াশিংটন যাব বলে বেরিয়েছি। পথে ফ্রাঙ্কফুর্ট আসবে জানতাম, কিনতু আবহাওয়া দুর্যোগে আরো একটা শহরে বিমান অবতরণ। হালকা হলেও মনে একটা নাড়াচাড়া। যদিও সবই গুড়ে বালি, প্লেন থেকে নামতে দিচ্ছেনা। মোটামোটি দম বন্ধ অবস্থা। সামনের সিট এ বসা বাঙ্গালী ভদ্রলোক ভারতবর্ষের সীমানা অতিক্রম করার পর কেমন যেন অচেনা আচরণ করছেন। বার দুএক কথা বলার চেষ্টা করলাম। কথার ধরন জার্মান রক্তের উচ্চ নাসা ভাবাপন্নতা কেও হার মানায়। আমিও অনেক কষ্টে নাসিকার নাশকতা নাশ করলাম। আমার ১১ মাসের ছেলে প্লেন থামলেই কাঁদে আর চললেই বেজায় খুশি। ব্রেকফাস্ট এ বোতল খানেক দুধ খেয়ে সে আবার ঢুলুঢুলু অক্ষি। কলগ্নে প্রায় ঘন্টা দেড়েক দাড়ানোর পরে প্লেন টা আবার চললো। সিট এ বসে সিনেমা দেখা ছাড়াও আর যেটা দেখলাম সেটা হলো প্লেন এর স্নান করা। মনে মনে বললাম এই শক্ত  ঠান্ডায় বাছাকে স্নান না করালেই হত না।  সর্দি কাশি হয়ে জর উঠলেই তো সর্বনাশ। 

ফ্রাঙ্কফুর্ট এ নামলাম তুমুল হাততালি তে।  Pilot সাংঘাতিক অবস্থায় বিমান অবতরণ করিয়েছেন।  যাত্রীগণ ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থায়।  আমার ছেলে ছাড়া সবাই গম্ভীর।  হাততালি টা বাড়াবাড়ি ছিল বোধ হোয় , কিনতু নামতে পেরে সত্যিই ভালো লাগছিল।  পরের প্লেন ঘন্টা দুই বাদে। যেতে হবে আরেক টার্মিনাল এ।  বউ বাচ্চা বগলদাবা করে ছুটলাম। প্রথম ধাক্কা খেলাম signboard দেখে।  ইংরাজির দেখা নাই। জার্মান জাতি গৌরব ইংরাজি জানা অজ পাড়াগেয়ে বাঙালিকে নিতান্ত ঝামেলায় ফেলল। কোন দিকে যাব কিছুই বুঝতে পারছিনা।  সঙ্গে একটা সহজপাঠ জার্মান নিয়ে আসা উচিত ছিল।  একটা কাউন্টার গোছের জায়গায় গেলাম এবং ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরাজি খানিকটা জার্মান সুরে জিগ্গেস করলাম।  এইটা আমি আগেও করেছি।  গৌহাটি বাস স্টেশন এ বাংলা ভাষা অসমীয়া স্টাইল এ বলে বেশ কাজ হয়েছিলো।  কাউন্টার এর জার্মান দাদা অবোধ্য জার্মানিতে যা বলল তা আমার মস্তিস্কের গভীরে অনুরণন টুকুও  সৃষ্টি করতে পারলনা।  এক সময় ভাবলাম শুদ্ধ বাংলায় জিগ্গেস করব ,"দাদা , করুনাময়ী কোন দিকে।" যা হোক শেষ পর্যন্ত অনেকটা সাইন লাঙ্গুয়াজে কথোপকথন হলো এবং বুঝতে পারলাম আমার গেট প্রায় ৩০ মিনিটের হাঁটা রাস্তা।  একটা কিছু পেলে ভালো , কিনতু সেটা জার্মান ভদ্রলোককে বোঝানো আমার মত মুক বধিরের পক্ষে খানিকটা অসম্ভব ।  সময় বুঝে আমার ছেলে তাড়িয়ে কান্না শুরু করলো। এইবার জার্মান দাদা নড়েচড়ে বসলেন। একটা গাড়ি ডেকে আমাদের বসিয়ে দিলেন এবং ড্রাইভার কে সমস্ত বুঝিয়ে দিলেন।  বুঝতে পারলাম বাচ্চার ভাষা সার্বজনীন।  সবাই বোঝে এবং পারতপক্ষে কেউ ঘাটাতে চায়না।  গাড়িতে বসে তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করলাম ফ্রাঙ্কফুর্ট এয়ারপোর্ট। 

সময় এ উঠলাম প্লেন এ।  যদিও সিকিউরিটির কড়াকড়িতে আমার বউ হাতের শাখা খোয়াতে বসেছিল।  কোনো মতে ব্যবস্থা করে নিজের পতির প্রাণ রখ্খা করলো।  প্লেন এ বসে বেজার মুখে cheese চিবিয়ে সারাটা রাস্তা কাটালাম।  ওয়াশিংটন এ যখন নামলাম সন্ধের আলো প্রায় রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে। সবকিছু সারতে সারতে প্রায় রাত ১০ টা বাজলো। মাল পত্র নিয়ে একটা ট্যাক্সি চেপে হোটেলের উদ্দেশে চললাম।  ট্যাক্সি চালক একজন কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিন।  আমাদের নতুন দেখে সবচেয়ে প্রথমে যে কথাটা বলল সেটা হলো , " এই দেশে সবাই সমান।  আমরা কাউকে বৈষম্য করিনা।" এই জ্ঞানগর্ভ কথা উপভোগ করতে করতে হটাত দেখলাম আমার স্ত্রী পাগলের মত সিকনেস ব্যাগ খুজছে এবং মুহুর্তের মধ্যে প্লেন এ খাওয়া cheese, extra creamy ice cream হিসাবে বেরিয়ে এলো।  ড্রাইভার বেচারা খানিকটা অসহায় ভাবে চেয়ে দেখল আর আমি মনে মনে ভাবলাম বোঝো ঠেলা।  এইবার ফলাও তোমার সাম্যবাদের শিখ্যা ।  




No comments:

Post a Comment